কাটা-খাউনি ও মেছো-পেত্নী
খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে রাজকুমারী একদম মা-বাপের যোগ্য পুত্রী। দুপুরে ও রাতে, আঁশটে গন্ধ যদি না থাকে পাতে, কান্না ও চিৎকারের ঠেলায়, বারান্দা হতে কাক-পক্ষী পালায়। এটা অবশ্য তার হেরিডিটারি।
মহারানীকে বাড়িতে ডাকতো কাঁটা-খাউনি বলে। বিয়ের পরে মহারানীকে নিয়ে জামশেদপুর এসেছি। কদমা বিজয়া হেরিটেজ কমপ্লেক্সে একটা ফ্ল্যাটে নতুন বাসা বেঁধেছি কপোত কপোতীতে।
এক রবিবার, সকালবেলা সাকচি বাজারে বেশ ভালো সাইজের পাবদা পেলাম। মহারানী বেজায় খুশি। শীল-নোড়ায় সর্ষে বেটে ও তা ছেকে বানালেন পাবদার ঝাল। রান্না কমপ্লিট করে মহারানী গেলেন স্নানে। স্নান সেরে রান্নাঘরে ফিরেই চিৎকার। আমি টিভি ছেড়ে দৌড়ে রান্নাঘরে, কি হলো? দরজায় পৌঁছাতেই স্টেনগান স্টার্ট।
"একটা মাছ খেলে কেন? এইটুকু তর সইছিল না? সাথে তুলতে গিয়ে কতটা সর্ষের ঝাল নষ্ট করেছ, কি দিয়ে ভাত মাখব এখন?" বলেই হাউমাউ করে কান্না। আমি তো থ। কিন্তু জানলার কাছে একটু সর্ষের দাগ দেখে সন্দেহ হওয়ায় বারান্দা দিয়ে উকি মারলাম। দেখি একটি মার্জার একতলার ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের কার্নিশে বসে মহানন্দে পাবদা মাছ খাচ্ছেন। কোনো মতে মহারানীকে শান্ত করে ব্যাপারটা বলতেই, রান্নাঘর থেকে নোড়াটা নিয়ে একছুটে বারান্দায়। দুম। ওটা ছুড়ে মারতে মেনি মাসি পালালেও কার্নিশের ও নোড়ার কিছুটা ভেঙেছে। মহারানী নিচে গিয়ে গজগজ করতে করতে নোড়া কুড়িয়ে ফিরতেই এবার নোড়ার লক্ষ্য আমার দিকে।
হয়েছে কি, বিড়ালে মুখ দিয়েছে দেখে বাকি তিনটে মাছ আমি ডাস্টবিনে ফেলছিলাম। তাই দেখে মহারানী রণচন্ডী। নোড়া লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার পরে স্টিলের দুটো গ্লাসও উড়ে এসেছিল স্কাড মিসাইলের মতো। সে দুটোও মিস হতেই মাটিতে বসে হাত পা ছড়িয়ে মহারানী যা কান্না জুড়লেন, দেখলে মনে হবে কোনো বাচ্চা চকলেটের জন্য কাঁদছে।
কি ভাগ্যিস,আমার মামাবাড়ি জামশেদপুর হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই শহরটা খুবই চেনা। এমনই চৈত্র মাসের শেষ ও একটি হোটেলে নববর্ষ স্পেশাল লাঞ্চ ও ডিনার চলছিল। ভরদুপুরে সেখানে নিয়ে গিয়ে রক্ষে পেয়েছিলাম।
কিন্তু গতকাল রাত্রে শেষরক্ষা হলো না। রবিবার রাজকুমারী বরোদা মাছ বাজারে আব্দার করেছিলেন, "বাবা, প্রন নেবে? মা চিলি প্রন খাবো।" ওনাকে সাধারণত চিংড়ি খুব কমই দেওয়া হয়। তা আব্দার যখন, নিলাম চাপড়া চিংড়ি হাফ কিলো। মহারানী সেটিকে বরফের কারাগারে বন্দি করে রাখলেও, রাজকুমারী ও নাছোড়বান্দা। শেষে কাল রাতে তৈরি হলো চিলি প্রন। খাওয়াও হল। গোল বাধলো তারপর। রাজকুমারীর দাবী, মাছু কই? যত বোঝাই এই তো চিংড়ি মাছ খেলি, কে শোনে কার কথা। (ভদ্রলোকের) এক কথা, ওটা তো ইনসেক্ট। মহারানী রেগে বললো, তাহলে তুই চিংড়ি মাছ কিনতে বললি কেন? সরল জবাব, আমি তো প্রন বলেছি। এবং তারপর হাত পা ছড়িয়ে কান্না।
বললাম না হেরিডিটারি! এমনি বলে কাটা-খাউনি ও মেছো-পেত্নি!!!!!! (আমার কোনো নাম না থাকলেও, আমিও ওই দলেই পড়ি যদিও)

Comments
Post a Comment